দেশ-বিদেশের সর্বশেষ ও নির্ভুল খবর সবার আগে জানতে ভিজিট করুন নতুন দৃষ্টিতে।
সম্পাদক: মোঃ আহসান উল্লাহ | প্রকাশক: মোঃ আতাউর রহমান রুবেল |
৫৭৮, শিক্ষকপল্লী, গাইটাল, কিশোরগঞ্জ।
স্বত্ব © নতুন দৃষ্টি ২০২৫
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
প্রতিবেদক: নাঈম ইসলাম, নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি।

শৈশবে ডান হাত মাথার ওপর দিয়ে ঘুরিয়ে বাঁ কান ধরতে না পারাটা ছিল আমার জীবনের প্রথম 'অযোগ্যতা'। ছয় বছর বয়সে এই সামান্য শারীরিক অপূর্ণতার অজুহাতে শিক্ষক যখন আমাকে স্কুলে ভর্তি করতে চাইলেন না, তখন মনে হয়েছিল যেন শুরুতেই পথচলা থমকে গেল। কিন্তু নিয়তির হিসাব ছিল অন্যরকম। ওই স্কুলেরই সভাপতি, আমার নানার হাত ধরে ৩২ নম্বর রোল নিয়ে যেদিন ভর্তি হলাম, সেদিন কেউ ঘুণাক্ষরেও ভাবেনি—এই ছেলেই পরের বছর সবাইকে পেছনে ফেলে ১ নম্বর রোল ছিনিয়ে আনবে।
আজ ১৭ বছর বয়সে নীলফামারী কালেক্টরেট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের এক কোণে বসে যখন নিজের রেজাল্ট শিটে পাঁচটি বিষয়ের পাশে 'ফেল' শব্দটি দেখি, তখন বুকটা হু হু করে ওঠে। ৪৩ জনের ক্লাসে ২৯তম অবস্থান আমাকে যেন বিদ্রূপ করে। হাফ ইয়ারলিতে ইংরেজি, পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, জীববিজ্ঞান ও গণিতে অকৃতকার্য হওয়ার এই গ্লানি আমাকে দমাতে পারেনি; বরং সেই '৩২ থেকে ১' হওয়ার পুরোনো জেদটাই বুকের ভেতর নতুন করে দাবানলের মতো জ্বালিয়ে দিয়েছে।
আমার জীবনটা কোনো রূপকথা নয়; এটি হাড়ভাঙা খাটুনি আর ত্যাগের এক জীবন্ত দলিল। নীলফামারীর তপ্ত রোদে আমার মা যখন জমির আইলে পুরুষের সমান তালে কাজ করেন, তখন আমার বাবা ঢাকার পিচঢালা পথে ঘাম ঝরিয়ে রিকশার প্যাডেল ঘোরান। বাবা রিকশা চালান কেবল আমার স্বপ্নগুলো কিনে দেওয়ার জন্য—এই ধ্রুব সত্যটিই আমার মেধার আসল জ্বালানি। ২০২৫ সালের এসএসসিতে ৩.৮৯ জিপিএ পাওয়ার পর বাবা যখন আনন্দে এলাকায় মিষ্টি বিলি করেছিলেন, তখন লোকচক্ষুর আড়ালে আমি নিজেকে বড় অপরাধী ভেবেছি। কারণ আমি জানতাম, বিজ্ঞান-শিক্ষকবিহীন সেই স্কুলে আমার বিজ্ঞানের ভিতটা কতটা নড়বড়ে ছিল।
আজ কলেজে উঠে সেই দুর্বল ভিতটাই আমাকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। কিন্তু সমাজ আর সমালোচকরা আমার যে লড়াইটা দেখেনি, তা হলো—হাজার হাজার প্রতিযোগীর ভিড়ে আমার লেখা কবিতা নির্বাচিত হয়ে প্রকাশিত হওয়া। আমি কেবল ব্যর্থতার গ্লানি বয়ে বেড়ানো কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী নই; আমি একজন কবি, অভাবজয়ী বাবা-মায়ের এক লড়াকু বড় সন্তান।
সামনে আর মাত্র কয়েকটা দিন। এই দিনগুলোই হবে আমার ঘুরে দাঁড়ানোর, আমার প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস। এসএসসির সেই শিক্ষক সংকটের শূন্যতা আজ আমি পূরণ করব নিজের রাতজাগা কঠোর পরিশ্রম দিয়ে। যারা আমার বাবা-মায়ের দারিদ্র্য নিয়ে হাসাহাসি করে, আমার কলমই হবে তাদের প্রতি মোক্ষম জবাব।
বড় স্বপ্ন দেখার জন্য যদি কোনো মাসুল দিতে হয়, তবে আমি তা দিতে প্রস্তুত। আমি জানি, অন্ধকার যত গভীর হয়, ভোরের আলো ততটাই উজ্জ্বল হয়। ৩২ থেকে যেমন ১ হওয়া যায়, তেমনি পাঁচটি বিষয়ের ব্যর্থতা টপকেও আকাশ ছোঁয়া যায়। আমার লড়াই কেবল শুরু হলো।