দেশ-বিদেশের সর্বশেষ ও নির্ভুল খবর সবার আগে জানতে ভিজিট করুন নতুন দৃষ্টিতে।
সম্পাদক: মোঃ আহসান উল্লাহ | প্রকাশক: মোঃ আতাউর রহমান রুবেল |
৫৭৮, শিক্ষকপল্লী, গাইটাল, কিশোরগঞ্জ।
স্বত্ব © নতুন দৃষ্টি ২০২৫
ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার বেআইনি।
প্রতিবেদক: নতুন দৃষ্টি নিউজ ডেস্ক


আরমান হোসেন
সময়ের আবর্তে আধুনিক যুগের এই যে চটুল রূপ, তাহা মানুষের বিবেককে কী নিদারুণভাবেই না ক্ষতবিক্ষত ও বিপর্যস্ত করিয়া দিয়াছে! ইহা এক অন্ধ অন্তরের করুণ কাহিনি, যেখানে হাহাকার ভিন্ন আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। মানুষের কিসে এত চাওয়া? কিসে এত লোভ-লালসা? এ যেন এক নবীন আবেগের মরণখেলা, যেখানে মানুষ হিতাহিত জ্ঞান হারাইয়া কেবল মরীচিকার পশ্চাতে ধাবিত হইতেছে।একদা এক উচ্চাভিলাষী যুবক মনে মনে সংকল্প করিয়াছিল— "কোন এক প্রভাতে আমি সকল মানুষের ঊর্ধ্বে স্থান পাইব, গগনচারী বিহঙ্গের ন্যায় উড্ডীন হইব।" তাহার এই আকাশচুম্বী লালসা তাহাকে এমনই অন্ধ করিয়াছিল যে, সে বিষধর সর্পের মস্তক হইতে মণি ছিনাইয়া আনিবার দুঃসাহস দেখাইতেও কুণ্ঠিত হয় নাই। অর্থাৎ, অতি ভয়ানক উপায়ে সে বিত্তশালী হইবার নেশায় মাতিয়া উঠিল।এই আধুনিক যুগে বিজ্ঞানের আশীর্বাদে ক্যান্সার ব্যতীত সকল ব্যাধিই যেন পরাজিত হইয়াছে; কিন্তু সমাজদেহে এক নূতন মরণব্যাধির আবির্ভাব ঘটিয়াছে, যাহার নাম 'জুয়া'। এই জুয়ার নীল দংশন লোকচক্ষুর অন্তরালে এক শিহরণ জাগানিয়া আতঙ্কে পরিণত হইয়াছে। একদল অসাধু চক্র বা প্রভাবশালী অধিপতি এই পঙ্কিল জগতের নিয়ন্ত্রক, আর একদল দিকভ্রান্ত যুবক হইল তাহার বাহক। ইহাদিগকেই আধুনিক যুগের 'নূতন রোগী' বলিয়া অভিহিত করা যায়, যাহারা অর্থের লোভে নিজেদের আত্মা বিক্রয় করিয়া দিয়াছে।দিন অতিবাহিত হয়, কালচক্র আবর্তিত হয়; কিন্তু সেই অন্ধ মোহের বশবর্তী যুবকটি পশ্চাতে ফিরিয়া তাকায় না। সে কেবল রুদ্ধশ্বাসে ধাবিত হয় এক অলীক প্রাসাদের পানে। তাহার স্বপ্নে বিভাসিত হয় বিশাল কালাপাহাড়ের ন্যায় সম্পদ, আহসান মঞ্জিলের ন্যায় ঐশ্বর্য আর ব্যাঘ্রের চক্ষুর ন্যায় দুর্মূল্য রত্নরাজি। তাহার বদ্ধমূল ধারণা জন্মিয়াছে যে, 'টাকা হইলে জগতের সকলই মিলে'।এইরূপে বহু দিবস অতিক্রান্ত হইল। মিথ্যা অভিনয় আর প্রবঞ্চনার পাহাড় গড়িয়া যুবকটি আজ শ্রান্ত। তাহার সেই রঙিন স্বপ্ন এখন দুঃস্বপ্নে পরিণত হইয়াছে। জুয়ার নেশায় ও লালসার আগুনে সর্বস্ব হারাইয়া সে আজ এক রিক্ত কঙ্কাল মাত্র। জীবনের অন্তিম লগ্নে আসিয়া সে বুঝিতে পারিল, যে উচ্চতায় সে উঠিতে চাহিয়াছিল, তাহা ছিল কেবল পতনের পূর্বাবস্থা। আজ সে পরাজিত, আজ সে রিক্ত। অন্য পথ খুঁজিবার উপায় নাই, কারণ তাহার সেই 'অন্ধ অন্তরের ব্যথা' উপশমের ঔষধ আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানেও আবিষ্কৃত হয় নাই।আধুনিক যুগের এই শাসককুল হয়তো নিয়তির সেই অমোঘ লিপি বা ললাটলিখন অনুধাবন করিতে পারেন নাই। এই জুয়া নামক ব্যাধিটি বিদ্যুৎগতিতে সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মহামারি অপেক্ষা দ্রুততর বেগে ছড়াইয়া পড়িতেছে। যাহার অন্তরের অভ্যন্তরে পাপের সহস্র পথ উন্মুক্ত, বাহিরের শাসন তাহাকে আর কীভাবেই বা সংযত করিবে?অবশেষে রিক্তহস্তে কিয়ৎকাল দম লইয়া যুবকটি ভাবিতে বসিল— পৈতৃক ভিটাখানি ব্যতীত তাহার আজ আর কিছুই অবশিষ্ট নাই। হায়! জীবনের এই কি সর্বনাশা পরিণতি? আপন কর্মের দায় এখন তাহাকে অন্যের দ্বারে দ্বারে ভিক্ষার পাত্র লইয়া দাঁড় করাইতেছে। আপনজনদিগকে সে নিজ হস্তে দুঃখের সাগরে ভাসাইয়াছে।এতক্ষণে তাহার পাষাণ হৃদয়ে বোধোদয় ঘটিল। সে বুঝিতে পারিল, এই অপরাধের গ্লানি বহন করিয়া তাহাকে হয়তো সুদূর পরবাসে নির্বাসিত হইতে হইবে। চিরতরে ছাড়িতে হইবে এই সোনার বাংলার শ্যামল প্রান্তর ও সবুজ পাহাড়। অবশেষে সেই পরম করুণাময়কে ডাকিবার তরে তাহাকে জায়নামাজেই ফিরিয়া আসিতে হইল। রুদ্ধকণ্ঠে সে নিবেদন করিল, "হে দয়াময়, তুমি ব্যতীত আজ আমার আর কেহই নাই!"কোথায় গেল সেই কঠোর পরিশ্রমের রক্তভেজা ঘাম? আজ সেই শ্রমের অসম্মান করিয়া সে বিলাসিতার কৃত্রিম আলোকসজ্জায় মত্ত হইয়াছিল। দ্বিতল অট্টালিকায় আরামের আশায় আজ সে নিঃস্ব হইয়া পরের দুয়ারে আশ্রিত। জীবনের এই জীবন-যুদ্ধে টিকিয়া থাকিবার তরে সে আজ রুদ্ধশ্বাসে দিগ্বিদিক জ্ঞানশূন্য হইয়া ছুটিয়া চলিতেছে— এক অসহায় জুয়া-পাগল পথিক।জীবন সংগ্রামের এই বিষম আবর্তে যুবকটি আরও একটি নির্মম সত্য উপলব্ধি করিল। একদা যাহারা তাহার সঙ্গীসাথি ছিল, আজ তাহারা নিজ নিজ ক্ষেত্রে কতই না প্রতিষ্ঠা লাভ করিয়াছে, অথচ তাহার কপালে এক রাতের তরেও ঘরের সুখ জুটিল না। এ যেন ভাগ্যের এক নিষ্ঠুর পরিহাস।সমাজের হিতৈষীদের নিকট এখন পরম প্রার্থনা— এই সর্বনাশা জুয়ার আড্ডাগুলি অতিসত্ত্বর বন্ধ করা আবশ্যক। ইহা যেন দমবিহীন এক অচল ঘড়ি, যাহার কোনো গতি নাই, কেবল স্থবিরতা। হে আধুনিক যুগের অসাধু কারবারিরা, তোমাদের চরণে মিনতি— এমন দশা যেন আর কাহারও ললাটে না জোটে। তোমাদের পঙ্কিল নেশার পরিণতি আজ তক্ষকের ন্যায় নিঃশব্দে দংশন করিতেছে এবং কেবল অশ্রুজলই ঝরিয়া পড়িতেছে।হে নবযুগের মোহগ্রস্ত জুয়াড়িরা! তোমাদের প্রতি মিনতি— যদি এই সংসার নামক রণক্ষেত্রে সসম্মানে বাঁচিয়া থাকিতে চাও, তবে এই জুয়া নামক মহামারীকে স্পর্শ করিও না, ইহাকে লালন করিও না। নচেৎ তোমাদের সফলতার রজ্জু ছিঁড়িয়া পড়িবে এবং জীবনের সকল অর্জন বৃথা হইয়া যাইবে।