৯ অক্টোবর ২০২৬
preview
চিঠির যুগের রানার, আজ ইতিহাসের গল্প

শহীদুল ইসলাম শরীফ, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার।

একসময় মানুষের সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালোবাসা আর দূরদেশের খবর পৌঁছে দিত চিঠি। সেই চিঠি গন্তব্যে পৌঁছে দিতে ছুটে চলতেন ‘রানার’রা। দুর্গম পথ, অন্ধকার রাত কিংবা ঝড়-বৃষ্টি। কোনো বাধাই তাঁদের থামাতে পারত না। সময় বদলেছে। কমেছে চিঠির ব্যবহার। তবে বাংলার ইতিহাস, সাহিত্য ও মানুষের স্মৃতিতে রানার আজও এক আবেগময় চরিত্র।

আজ ৯ অক্টোবর, বিশ্ব ডাক দিবস। আধুনিক ডাকব্যবস্থার অগ্রগতির এই দিনে স্মরণ করা প্রয়োজন সেই রানারদের। তাঁদের নিরলস শ্রমে একসময় দূর-দূরান্তের মানুষের মধ্যে গড়ে উঠত যোগাযোগের সেতুবন্ধ।

একসময় ছিল না মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট কিংবা তাৎক্ষণিক বার্তা পাঠানোর সুযোগ। প্রিয়জনের খবর জানতে মানুষ অপেক্ষা করত চিঠির জন্য। জরুরি সংবাদ পৌঁছে দিতেও ডাকব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হতো।

সেই ব্যবস্থায় রানারদের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁদের কাজ ছিল এক ডাককেন্দ্র থেকে অন্য ডাককেন্দ্রে চিঠির থলে পৌঁছে দেয়া। এ জন্য পাড়ি দিতে হতো দীর্ঘ পথ। কোথাও ছিল কাঁচা রাস্তা, কোথাও নদী-খাল। কখনো মোকাবিলা করতে হতো প্রতিকূল আবহাওয়া।

রাতের নির্জন পথেও থামত না তাঁদের যাত্রা। কাঁধে চিঠির ব্যাগ নিয়ে ছুটে চলতেন তাঁরা। ক্লান্তি, ব্যক্তিগত কষ্ট ও নানা বাধা পেরিয়ে পৌঁছে দিতেন মানুষের বার্তা। সময়মতো চিঠি পৌঁছে দেয়াই ছিল তাঁদের দায়িত্ব।

বাংলা সাহিত্যে রানার কে স্মরণীয় করে রেখেছেন কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য। তাঁর ‘রানার’ কবিতায় উঠে এসেছে এক নিরন্তর ছুটে চলা মানুষের জীবন। ফুটে উঠেছে দায়িত্ববোধ, শ্রম, ঝুঁকি ও সংগ্রামের চিত্র।

রানার এখানে শুধু একজন ডাকবাহক নন। তিনি শ্রমজীবী মানুষের প্রতীক। তাঁর ছুটে চলার মধ্যে রয়েছে কর্তব্যের তাগিদ। রয়েছে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে লড়াইয়ের গল্প।

রানারের হাতে থাকা একটি চিঠি কারও কাছে ছিল প্রিয়জনের খবর। কারও কাছে তা ছিল দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান। আবার কারও জীবনে সেই চিঠিই বয়ে আনত নতুন আশার আলো। এভাবেই রানার হয়ে উঠেছিলেন মানুষের অনুভূতি ও সম্পর্কের নীরব বাহক।

সময় বদলেছে। বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে যোগাযোগব্যবস্থা হয়েছে দ্রুত ও সহজ। মোবাইল ফোন, ই-মেইল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে এখন মুহূর্তেই বার্তা পৌঁছে যায় পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে।

ফলে হাতে লেখা চিঠির ব্যবহার অনেক কমেছে। বদলে গেছে ডাকব্যবস্থার ধরনও। একসময় গ্রাম থেকে শহরে কিংবা প্রত্যন্ত জনপদে চিঠি পৌঁছে দেয়ার যে পরিচিত দৃশ্য ছিল, তা এখন অনেকটাই অতীত।

নতুন প্রজন্মের কাছে রানার এখন ইতিহাস ও সাহিত্যের চরিত্র। তবু ডাকব্যবস্থার বিকাশে তাঁর অবদান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কারণ, একসময় মানুষের সঙ্গে মানুষের যোগাযোগ রক্ষায় তাঁরাই ছিলেন অন্যতম ভরসা।

প্রতি বছর ৯ অক্টোবর বিশ্ব ডাক দিবস পালিত হয়। ১৮৭৪ সালের এই দিনে সুইজারল্যান্ডের বার্নে ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন প্রতিষ্ঠার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। পরে ১৯৬৯ সালে টোকিওতে অনুষ্ঠিত সংস্থাটির কংগ্রেসে দিনটিকে বিশ্ব ডাক দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।

২০২৬ সালের প্রতিপাদ্য ‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’। বর্তমান সময়ে ডাকব্যবস্থা শুধু চিঠি আদান-প্রদানে সীমাবদ্ধ নয়। পার্সেল পরিবহন, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিভিন্ন আর্থিক সেবায়ও ডাক নেটওয়ার্ক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এই অগ্রযাত্রার পেছনে রয়েছে দীর্ঘ ইতিহাস। রয়েছে অসংখ্য কর্মীর শ্রম ও নিষ্ঠা। সেই ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়জুড়ে রয়েছেন রানাররা।

আজকের দ্রুতগতির পৃথিবীতে রানারদের স্মরণ করা মানে শুধু অতীতকে ফিরে দেখা নয়। এটি শ্রমজীবী মানুষের অবদানকে সম্মান জানানোরও একটি উপলক্ষ।

প্রযুক্তি বদলেছে। বদলেছে যোগাযোগের মাধ্যম। কিন্তু মানুষের সঙ্গে মানুষের সংযোগের প্রয়োজন ফুরিয়ে যায়নি। একসময় সেই সংযোগ রক্ষায় রানাররা পালন করেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।

কাঁধে চিঠির বোঝা নিয়ে পথে পথে ছুটে চলা সেই মানুষগুলো আজ আর আগের মতো দৃশ্যমান নন। তবু তাঁদের অবদান রয়ে গেছে ইতিহাসের পাতায়, সাহিত্যের পঙ্‌ক্তিতে ও মানুষের স্মৃতিতে।

বিশ্ব ডাক দিবসে তাই রানারদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো জরুরি। তাঁদের জীবনসংগ্রাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়, একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার পেছনেও থাকতে পারে শ্রম, ত্যাগ ও দায়িত্বের দীর্ঘ গল্প।

মাধ্যম বদলায়, সময় বদলায়। কিন্তু মানুষের কাছে মানুষের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্ব কখনো ফুরিয়ে যায় না।


সম্পাদক: মোঃ আহসান উল্লাহ | প্রকাশক: মোঃ আতাউর রহমান রুবেল |

ফোন : 01715248243 (Whatsapp), ই-মেইল: notundrishti247@gmail.com