আজিজুল হক
মো: আবু তাহের পাটোয়ারী:
মানুষের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা অজ্ঞতা নয়-নিজের অজ্ঞতা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকা।একজন মানুষ যখন অল্প কিছু জানে,তখন সেই অল্প জ্ঞানকেই অনেক সময় সম্পূর্ণ জ্ঞান বলে মনে হয়। সে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কথা বলে,তর্ক করে,অন্যের মতামতকে তুচ্ছ করে এবং মনে করে-আমি জানি।অথচ জ্ঞানের বিশাল সমুদ্রের সামনে তার অর্জন হয়তো এক ফোঁটা পানির বেশি কিছু নয়।মনোবিজ্ঞানে এ প্রবণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাখ্যা রয়েছে
-Dunning-Kruger effect। ১৯৯৯ সালে মনোবিজ্ঞানী David Dunning ও Justin Kruger-এর গবেষণায় দেখা যায়,কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ে কম দক্ষ ব্যক্তিরা নিজেদের দক্ষতাকে বাস্তবতার তুলনায় বেশি মূল্যায়ন করতে পারেন। কারণ নিজের ভুল শনাক্ত করার জন্য যে জ্ঞান ও বিচারক্ষমতা প্রয়োজন,সেটিও অনেক সময় তাদের পর্যাপ্ত থাকে না।অর্থাৎ সমস্যা শুধু “কম জানা” নয়;ভয়ংকর সমস্যা হলো-আমি যে কম জানি,সেটাই বুঝতে না পারা।
প্রথম স্তর:অল্প জ্ঞান,বেশি অহংকার জ্ঞান অর্জনের প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস দ্রুত বেড়ে যেতে পারে। কয়েকটি বই পড়েছে,কিছু তথ্য মুখস্থ করেছে,সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ভিডিও দেখেছে কিংবা কয়েকটি রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনার খবর জেনেছে-ব্যস!তারপরই অনেকের মনে হয়,সে সংশ্লিষ্ট বিষয়ের বিশেষজ্ঞ!এই পর্যায়ের মানুষকে আপনি চেনার সহজ উপায় হলো-সে বেশি কথা বলে,কিন্তু কম শোনে।সে প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত,কিন্তু নিজের কাছে প্রশ্ন করার জন্য প্রস্তুত নয়।সে অন্যের ভুল খুঁজে বেড়ায়,নিজের ভুল খুঁজে দেখে না।সে বিতর্কে জিততে চায়,সত্য জানতে চায় না।আর সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো-তার আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তার প্রকৃত জ্ঞানের পরিমাণের কোনো সামঞ্জস্য নাও থাকতে পারে।তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি: Dunning-Kruger effect কোনো মানুষকে সামগ্রিকভাবে “বোকা” বা “অযোগ্য” বলে চিহ্নিত করার তত্ত্ব নয়। এটি নির্দিষ্ট কোনো দক্ষতা বা জ্ঞানের ক্ষেত্রে নিজের সক্ষমতা ভুলভাবে মূল্যায়নের একটি cognitive bias।
দ্বিতীয় স্তর: জ্ঞান মানুষকে বিনয়ী করে মানুষ যখন সত্যিকার অর্থে পড়তে শুরু করে,গবেষণা করে,বিভিন্ন মতের মানুষের কথা শোনে এবং নিজের ধারণাকে প্রশ্ন করতে শেখে-তখন তার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে শুরু করে।তখন সে বুঝতে পারে-আমি যা জানি,তার চেয়ে যা জানি না-তার পরিমাণ অনেক বেশি।এটাই জ্ঞানের একটি বড় পরিবর্তন।একজন সত্যিকারের শিক্ষার্থী তাই প্রতিটি বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে প্রশ্ন করে। সে বলে-আরও তথ্য দরকার।আমি বিষয়টি পুরোপুরি জানি না।অন্য পক্ষের বক্তব্যটাও শুনতে হবে।আমার ধারণা ভুলও হতে পারে।এই বাক্যগুলো দুর্বলতার চিহ্ন নয়;বরং বুদ্ধিবৃত্তিক পরিপক্বতার লক্ষণ।গভীর জ্ঞান মানুষকে শুধু তথ্য দেয় না,নিজের সীমাবদ্ধতাও দেখায়। গবেষণায় দেখা যায়,দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কোনো বিষয়ের জটিলতা,ব্যতিক্রম ও নিজের জ্ঞানের সীমা আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করতে পারে।
তৃতীয় স্তর:আমি সব জানি না-এটাই জ্ঞানের সৌন্দর্য
জ্ঞান যখন আরও গভীর হয়,তখন মানুষ আবিষ্কার করে-
প্রতিটি উত্তরের পেছনে আরও দশটি প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে।
বিজ্ঞান যত এগিয়েছে,অজানার সীমানাও তত বড় হয়েছে।
একজন প্রকৃত জ্ঞানী তাই অহংকারের ভাষায় বলেন না-আমি সব জানি।বরং তার মধ্যে জন্ম নেয় এক ধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক বিনয়।সে জানে,পৃথিবীর ইতিহাস বিশাল। বিজ্ঞান বিশাল। দর্শন বিশাল। অর্থনীতি,রাষ্ট্রবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক,প্রযুক্তি,সাহিত্য-প্রতিটি ক্ষেত্রই অসীম।
তাই জ্ঞানী মানুষ অন্যকে চুপ করিয়ে দিতে চান না;তিনি অন্যের কাছ থেকেও শিখতে চান।এখানেই অজ্ঞতা ও জ্ঞানের সবচেয়ে বড় পার্থক্য।অজ্ঞ মানুষ ভাবে-সে সব জানে।জ্ঞানী মানুষ জানে-তার শেখার এখনও অনেক বাকি।
তবে এখানেও একটি সতর্কতা আছে। “আমি কিছুই জানি না-এই বাক্যকে আক্ষরিক অর্থে নিয়ে আত্মঅবমূল্যায়ন করাও ঠিক নয়। প্রকৃত জ্ঞান আত্মবিশ্বাস ধ্বংস করে না; বরং আত্মবিশ্বাসকে বাস্তবতার ওপর দাঁড় করায়। উচ্চ দক্ষতার মানুষও কখনো কখনো নিজের সক্ষমতাকে কম মূল্যায়ন করতে পারেন-তাই অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস যেমন সমস্যা,অতিরিক্ত আত্মসন্দেহও আদর্শ নয়।
ফেসবুক বিশ্ববিদ্যালয় নয়-জ্ঞান অর্জনে পরিশ্রম লাগে
আজকের পৃথিবীতে তথ্য পাওয়া অত্যন্ত সহজ। হাতে একটি স্মার্টফোন,সামনে ইন্টারনেট-হাজার হাজার তথ্য মুহূর্তের মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে।কিন্তু তথ্য পাওয়া আর জ্ঞান অর্জন এক জিনিস নয়।একটি ফেসবুক পোস্ট পড়া মানেই ইতিহাস জানা নয়।একটি ইউটিউব ভিডিও দেখা মানেই অর্থনীতি বোঝা নয়।কোনো রাজনৈতিক দলের প্রচারপত্র পড়া মানেই রাজনীতি বোঝা নয়।একটি সংবাদ শিরোনাম পড়া মানেই পুরো ঘটনা জানা নয়।জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজন-পড়া,যাচাই করা,তুলনা করা,প্রশ্ন করা এবং চিন্তা করা।একজন সচেতন নাগরিককে তাই প্রতিদিন সংবাদপত্র পড়তে হবে।শুধু নিজের পছন্দের খবর নয়-বিপরীত মতের সংবাদও পড়তে হবে।সম্পাদকীয় পড়তে হবে।উপসম্পাদকীয় পড়তে হবে।দেশের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংবাদ জানতে হবে।ইতিহাস পড়তে হবে।অর্থনীতি বুঝতে হবে।রাষ্ট্রব্যবস্থা ও সংবিধান সম্পর্কে ধারণা রাখতে হবে।বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পরিবর্তন সম্পর্কে জানতে হবে।সাহিত্য পড়তে হবে।দর্শনের বই পড়তে হবে।আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ-যে বই আমাদের পূর্বধারণাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে,সেই বইও পড়তে হবে।কারণ নিজের মতের সঙ্গে মেলে এমন বই শুধু আমাদের বিশ্বাসকে শক্তিশালী করে;ভিন্নমতের ভালো যুক্তি পড়লে আমাদের চিন্তাশক্তি শক্তিশালী হয়।
সংবাদপত্র কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?একজন সমাজসচেতন মানুষের জন্য সংবাদপত্র শুধু খবরের কাগজ নয়; এটি একটি সমাজের প্রতিদিনের আয়না।সংবাদ আমাদের জানায় কী ঘটেছে।সম্পাদকীয় প্রশ্ন তোলে-কেন ঘটেছে।
উপসম্পাদকীয় বিশ্লেষণ করে-এর পরিণতি কী হতে পারে।
আর পাঠকের দায়িত্ব হলো-সবকিছু অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে যাচাই করা।আজকের তথ্যবিস্ফোরণের যুগে misinformation, confirmation bias এবং sensationalism মানুষের চিন্তাকে সহজেই প্রভাবিত করতে পারে। তাই সংবাদ পড়ার পাশাপাশি সংবাদ যাচাইয়ের অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে।একজন শিক্ষিত মানুষ শুধু প্রশ্ন করে না-প্রশ্নটির উৎসও যাচাই করে।পড়াশোনা মানে শুধু পরীক্ষায় পাস করা নয়
আমাদের সমাজে পড়াশোনাকে অনেক সময় চাকরি, পরীক্ষা কিংবা ডিগ্রির সঙ্গে সীমাবদ্ধ করে দেখা হয়।
এটি বড় ভুল।পড়াশোনার আসল উদ্দেশ্য হলো-মানুষের চিন্তার পরিধি বড় করা।একজন মানুষ যত বেশি পড়ে, তত বেশি মানুষের জীবন,ইতিহাস,সংস্কৃতি,ব্যর্থতা,সাফল্য ও চিন্তার সঙ্গে পরিচিত হয়।বই আমাদের এমন মানুষদের সঙ্গ দেয়,যাদের সঙ্গে বাস্তব জীবনে কখনো দেখা হওয়ার সুযোগ নেই।একজন দার্শনিক আমাদের চিন্তা করতে শেখান।একজন ইতিহাসবিদ অতীত থেকে শিক্ষা নিতে শেখান।একজন বিজ্ঞানী প্রমাণের গুরুত্ব শেখান।
একজন সাহিত্যিক মানুষের অনুভূতি বুঝতে শেখান।
একজন অর্থনীতিবিদ সম্পদের ব্যবস্থাপনা বুঝতে সাহায্য করেন।আর একজন ভালো সাংবাদিক শেখান-ঘটনার পেছনের ঘটনাটিও দেখতে।
জ্ঞানীর সবচেয়ে বড় পরিচয়-সে শেখা বন্ধ করে না
জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ হলো-এক পর্যায়ে এসে মানুষ মনে করে,“আমি যথেষ্ট জানি।”সেখানেই তার মানসিক অগ্রগতি থেমে যেতে পারে।যে ব্যক্তি প্রতিদিন নতুন কিছু শেখে,সে গতকালের নিজের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে।আর যে ব্যক্তি মনে করে সে সব জানে,সে অন্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই জীবন কাটায়।এই দুই মানুষের পার্থক্য বিশাল।একজন জ্ঞান খোঁজে।অন্যজন স্বীকৃতি খোঁজে।একজন সত্য খোঁজে।অন্যজন নিজের বক্তব্যের জয় খোঁজে।একজন ভুল হলে সংশোধন করে।অন্যজন ভুল প্রমাণিত হলেও যুক্তি খুঁজে নিজেকে সঠিক প্রমাণ করতে থাকে।এই পার্থক্যই মানুষকে আলাদা করে।আজকের সমাজে আমাদের সবচেয়ে বেশি দরকার বুদ্ধিবৃত্তিক বিনয় আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি,যখন প্রত্যেকের হাতে প্রকাশের ক্ষমতা রয়েছে।আগে মতামত প্রকাশ করতে পত্রিকায় লিখতে হতো। এখন কয়েক সেকেন্ডেই হাজার মানুষের কাছে বক্তব্য পৌঁছে যায়।এই ক্ষমতা যেমন সম্ভাবনার,তেমনি দায়িত্বেরও।তাই কথা বলার আগে জানতে হবে।লেখার আগে পড়তে হবে।শেয়ার করার আগে যাচাই করতে হবে।সমালোচনা করার আগে বুঝতে হবে।আর সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে শুনতে হবে।কারণ আত্মবিশ্বাসী ভুল তথ্য একজন মানুষের ক্ষতি করতে পারে; কিন্তু আত্মবিশ্বাসী ভুল তথ্য যখন হাজার মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে,তখন তা সমাজের ক্ষতি করতে পারে।
জ্ঞানের শেষ নেই জ্ঞান কোনো গন্তব্য নয়;এটি একটি আজীবন যাত্রা।আজ যে মানুষটি নিজেকে অনেক জ্ঞানী মনে করছে, কাল আরও বেশি পড়লে হয়তো বুঝবে-
তার জানার জায়গা কত সীমিত।আজ যে মানুষটি অন্যের কথা শুনতে চায় না,কাল সে যদি বইয়ের কাছে বসে, ইতিহাসের কাছে বসে,বিজ্ঞানীর গবেষণা পড়ে,ভিন্নমতের মানুষের যুক্তি শোনে-তাহলে তার চিন্তার জগৎ বদলে যেতে পারে।তাই জীবনের প্রতিদিন নিজেকে একটি প্রশ্ন করা দরকার-আমি আজ নতুন কী শিখলাম?আরেকটি প্রশ্ন-
আমি যে বিষয়টি নিশ্চিতভাবে সত্য বলে বিশ্বাস করছি,
সেটি কি সত্যিই যাচাই করেছি?এই দুটি প্রশ্ন একজন মানুষকে অহংকার থেকে জ্ঞানের পথে নিয়ে যেতে পারে।মনে রাখতে হবে-অল্প জ্ঞান মানুষকে আত্মতুষ্ট করতে পারে।গভীর জ্ঞান মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়।আর সত্যিকারের প্রজ্ঞা মানুষকে বিনয়ী করে।সুতরাং জ্ঞান অর্জনের জন্য পড়ুন।শুধু নিজের মতের বই নয়-ভিন্নমতের বইও পড়ুন।শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়-প্রতিদিন সংবাদপত্র পড়ুন।শুধু খবর নয়-সম্পাদকীয় ও উপসম্পাদকীয় পড়ুন।শুধু দেশ নয়-বিশ্বকে জানুন।শুধু তথ্য নয়-তথ্যের উৎস যাচাই করুন।শুধু কথা বলবেন না-শুনুন।শুধু তর্ক করবেন না-চিন্তা করুন।কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় লাইব্রেরিতেও জ্ঞানের শেষ নেই।যে দিন মানুষ মনে করবে “আমি সব জানি”সেদিন তার শেখার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।আর যে মানুষ প্রতিদিন বলতে পারে-“আমি আরও শিখতে চাই”তার সামনে জ্ঞানের দরজা কখনো বন্ধ হয় না।
মো: আবু তাহের পাটোয়ারী
সম্পাদক,নবজাগরণ
সাপ্তাহিক পত্রিকা
সম্পাদক: মোঃ আহসান উল্লাহ | প্রকাশক: মোঃ আতাউর রহমান রুবেল |
ফোন : 01715248243 (Whatsapp), ই-মেইল: notundrishti247@gmail.com