আব্দুল বাছির সা'দী
আলজেরিয়ার পতাকায় মোড়ানো যে কফিনগুলো দেখছেন সেগুলো গতানুগতিক কোনো কফিন নয়। বরং এগুলো আফ্রিকার বুকে ফ্রান্স যে ঔপনিবেশিক বর্বরতা চালিয়েছিল তার নিদর্শন, আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মাথার খুলি।
এই খুলিগুলো তৎকালীন ফরাসিরা তাদের বিজয়ের ট্রফি হিসেবে প্যারিসে পাঠিয়েছিল। আর সেগুলোকে তারা স্বযত্নে রেখেছিল প্যারিসের মুজে দে লোম বা মিউজিয়াম অব ম্যানকাইন্ডে। ২০২০ সালে আলজেরিয়ার সাথে সম্পর্ক পুনর্গঠনের লক্ষ্যে ২৪টি মাথার খুলি ফেরত পাঠায় ফ্রান্স।
আইফেল টাওয়ারের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকা ঝলমলে এই জাদুঘরে কমপক্ষে ১৮ হাজার মানব খুলি আছে, যার মধ্যে অসংখ্য মানবখুলির উৎস আফ্রিকা। যেখান থেকে ফরাসিরা সম্পদ লুট করেছে, লাখ লাখ মানুষকে নির্মমভাবে হ*ত্যা করেছে এবং আজ অবধি তারা তাদের নব্য ঔপনিবেশিকতা অব্যাহত রেখেছে নানা ফরম্যাটে।
আলজেরিয়ার প্রতিরোধ যোদ্ধারা ফরাসিদের নৃশংস দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। সেসব প্রতিরোধকে দমন করার জন্য এমন কোনো বর্বরতা ছিল না যা ফরাসিরা করেনি। এমনকি তারা প্রতিরোধ যু দ্ধে শহীদ সেনারা মর্যাদাপূর্ণ দাফনেরও সুযোগ দেয়নি। শহীদ যোদ্ধাদের শিরচ্ছেদ করে আলজেরিয়ার সাধারণ জনগণের সামনে প্রদর্শন করা হতো, যাতে তারা আর বিদ্রোহ করার সাহস না পায়।
পাশাপাশি তারা এসব ছিন্ন মস্তক বাক্স বন্দী করে প্যারিসে পাঠাতো, যার মাধ্যমে শাসকদের বার্তা দেওয়া হতো আফ্রিকায় ফরাসিদের প্রকৃত বিজয় অর্জিত হচ্ছে, লুণ্ঠন আর দখল দারিত্ব ঠিকঠাকই চলছে। সেই সব প্রতিরোধ যোদ্ধাদের মাথার খুলি ফরাসিরা প্যারিসের মিউজিয়াম অব ম্যানকাইন্ডে রেখে দিয়েছিল।
এবং সেখানে যে ১৮ হাজার মানব খুলি আছে তার অসংখ্যের উৎস অস্পষ্ট এবং হাজার হাজার খুলি বেজমেন্টে লুকিয়ে রাখা ছিল। ধারণা করা হয় এসবের মধ্যে আলজেরিয়ার আরো অনেক মানুষের মাথার খুলি রয়ে গেছে। যাদের মধ্যে প্রতিরোধ যোদ্ধা থেকে শুরু করে অনেক আলেমও আছেন।
.
১৮৩০ সালে আলেজেরিয়া দখল করে ফ্রান্স। এরপর তারা সাধারণ আলজেরীয় নাগরিকদের থেকে উর্বর জমিগুলো কেড়ে নেয়। ফলে হাজার হাজার পরিবার ভূমিহীন ও নিঃস্ব হয়ে পড়ে। সামাজিক কাঠামো ভেঙে যায়। সেখানকার প্রশাসন, শিক্ষা ও ব্যবসাতে ফরাসিদের আধিপত্য বাড়তে থাকে এবং এক সময় ফ্রান্স আলজেরিয়াকে তাদের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করা শুরু করে।
ফরাসিদের এই দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে আলজেরীয়রা যখন প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করতো তখন তাদের উপর নেমে আসতো ভয়াবহ নির্যাতন। কালেকটিভ পানিশমেন্ট হিসেবে গ্রামের পর গ্রাম জ্বালিয়ে দেওয়া হতো। এমনকি শত শত আলজেরীয়কে গুহার ভেতরে বন্দী করে ধোঁয়ায় শ্বাসরোধ করে হ ত্যা করার নজিরও আছে।
১৯৪৫ সালে ৮ মে যখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ সমাপ্ত হয়, তখন অনেক আলজেরীয় ভেবেছিলেন এবার হয়তো তারাও মুক্ত। দেশটির সেতিফ শহরে হাজার হাজার মানুষ বিজয় মিছিল নিয়ে রাস্তায় নামে এবং নিজেদের পতাকা উত্তোলন করে। কিন্তু সেসব মিছিলে গুলি চালিয়ে একদিনে ৪৫ হাজার মানুষকে হ ত্যা করে ফরাসিরা। এর মাধ্যমে জানিয়ে দেওয়া হয় স্বাধীনতা শুধু ইউরোপের জন্য, তোমাদের জন্য নয়।
এরপর ১৯৫৪ সালে শুরু হয় আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রাম। আট বছরব্যাপী চলা সেই যুদ্ধে ১৫ লক্ষ মানুষকে হ ত্যা করে ফরাসিরা। শুধু সেখানেই থেমে থাকেনি, আলজেরিয়ার স্বাধীনতার আগে পরে মিলিয়ে সেখানে প্রায় ১৭টি পারমাণবিক পরীক্ষা চালায় ফ্রান্স। যার ফলে আজও স্থানীয় আলজেরীয়দের স্বাস্থ্যগত সমস্যায় ভুগতে হচ্ছে।
১৮৩০ সালে ফরাসিরা আলজেরিয়া দখল করার পর থেকে দেশটির মুসলিম আইডেন্টি মুছে ফেলার চেষ্টা করেছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ মসজিদ থেকে শুরু করে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে তারা ধ্বংস করে দেয়।
সেই সময় আলজেরিয়ানরা এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো থেকেই শিক্ষা গ্রহণ করতো। ঔপনিবেশিক সরকার এসব প্রতিষ্ঠানে অর্থ বরাদ্দ বন্ধ করে দেয়। যার ফলে প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস হয়ে যায়।
এসব প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার ফলে আলজেরিয়ার সিংহভাগ জনগণ নিরক্ষর হয়ে পড়ে৷ যেসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান টিকেছিল সেসব থেকে আরবিকে সরিয়ে ফ্রেঞ্চ কারিকুলাম চালু করা হয়। সবমিলিয়ে ফরাসিরা আলজেরিয়া থেকে ইসলামকে মুছে ফেলার চেষ্টা করে। কিন্তু আলজেরিয়ানদের হৃদয় ছিল ইসলামের আলোয় উদ্ভাসিত।
যে কারণে ১৯৬২ সালে ফরাসিদের হাত থেকে আলজেরিয়ানরা যখন স্বাধীনতা পায় তখন দেশটির সাধারণ জনগণ স্লোগান দিয়েছিল-
"ইয়া মুহাম্মাদ মাবরুক আলাইক, আল জাজা আ রাজআ তিব "
"হে মুহাম্মদ (সাঃ), আপনাকে অভিনন্দন। আলজেরিয়া আবার আপনার কাছে ফিরে এসেছে।"
সম্পাদক: মোঃ আহসান উল্লাহ | প্রকাশক: মোঃ আতাউর রহমান রুবেল |
ফোন : 01715248243 (Whatsapp), ই-মেইল: notundrishti247@gmail.com