নতুন দৃষ্টি নিউজ ডেস্ক
মাওলানা আঃবাছির সাদী
এক.
ইরানের ওপর আমেরিকা ও ইসরায়েলের যৌথ আক্রমণ শুধু মধ্যপ্রাচ্যই নয়; পুরো পৃথিবীর অশান্তি ও অস্থিতিশীলতার বড় কারণ হয়ে উঠেছে। মধ্যপ্রাচ্য এমনিতেই দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতে জর্জরিত; আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও বিশ্বমোড়লদের ভূরাজনৈতিক ষড়যন্ত্রে নিষ্পেষিত; সেখানে নতুন করে এই যুদ্ধ বৈশ্বিক তীব্র সংকট ও অস্থিরতার সূচনা করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার ইতিহাসে ইসরায়েল দুরারোগ্য ব্যাধি ক্যান্সারের নাম, একটি বিষফোঁড়া। তবে একই সঙ্গে বাস্তবতা হলো, ইরানও নানাসময়ে আঞ্চলিক সংঘাতকে উসকে দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ামক ভূমিকা পালন করেছে। সিরিয়ায় গণহত্যার সময় ইরান প্রকাশ্যে শিয়া শাসক বাশার আল-আসাদের পাশে দাঁড়িয়েছে, লাখো সুন্নী মুসলমান হত্যায় প্রত্যক্ষ সহায়তা করেছে। আবার ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের সময় কিংবা লিবিয়ায় পশ্চিমা হস্তক্ষেপের ক্ষেত্রেও ইরানের সহযোগিতামূলক ভূমিকা ছিল। তা ছাড়া ইসরাইলের বোমার আঘাতে হামাস প্রধান ইসমাইল হানিয়ার শাহাদাতেও ইরানের ভূমিকাও আপত্তি মুক্ত নয়। ইসমাইল হানিয়া সে সময় রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসেবে ইরানেই অবস্থান করছিলেন।
শিয়াইজমকে ভিত্তি করে মধ্যপ্রাচ্যে একক আধিপত্য বিস্তার করা ইরানের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা। যে কারণে অতীতে দুইবার সে হারাম শরিফেও আক্রমণ করেছে। তাছাড়া লেবাননের হিজবুল্লাহসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে নানা প্রক্সি শক্তির মাধ্যমে সংঘাত ও গৃহযুদ্ধের পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে ইরান। ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় ইসরায়েল গোপনে ইরানকে অস্ত্র সরবরাহও করেছে।
এই ধরনের অতীত ইতিহাসই বর্তমানে ইরানকে কূটনৈতিকভাবে নিঃসঙ্গ ও মিত্রহীন করে তুলেছে। মধ্যপ্রাচ্যে শিয়াকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তারের যে কৌশল ইরান দীর্ঘদিন ধরে অবলম্বন করেছে, তাও ইরানের মিত্রহীনতার অন্যতম কারণ। তবে এইসব অতীত প্রেক্ষাপট থাকা সত্ত্বেও বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে কোনো শান্তিপ্রিয় মানুষই যুদ্ধ কামনা করতে পারে না। আমরা চাই এই সংঘাতের দ্রুত অবসান হোক। একই সঙ্গে ইরানেরও উচিত তার পলিসিতে পরিবর্তন আনা। বিশেষ করে ইরানে বসবাসরত সুন্নী মুসলমানদের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার নিশ্চিত করা। ইরানে সুন্নী মুসলমানরা ধর্মীয় ও নাগরিক নানা অধিকার থেকে বঞ্চিত, তেহরানে সুন্নী মুসলমানদের পৃথক মসজিদ নির্মাণ নিষিদ্ধ এবং আদালতে বিচারিক বৈষম্যেরও শিকার। যদি ইরান তার ভেতরে এইসব বিষয়ে পলিসিগত পরিবর্তন আনতে পারে, তাহলে মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে তার সম্পর্ক উন্নত হবে এবং মিত্র পাবে বলে মনে করি।
পৃথিবীর প্রায় সকল যুদ্ধ ও সংঘাতের পেছনে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কথিত বিশ্বমোড়ল আমেরিকার হাত রয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার নামেই সে অশান্তি প্রতিষ্ঠা করছে, পুরো পৃথিবীতে নৈরাজ্য, আধিপত্যবাদ তৈরি করছে। সে হলো ডাকাত স্বরূপ, দস্যু স্বরূপ। একক বিশ্বমোড়ল, সন্ত্রাসী। সব দেশে, বিশেষত দুর্বল উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সরাসরি আক্রমণ করছে বা গৃহযুদ্ধ জারি রাখছে। সামরিক চাপ, অর্থনৈতিক অবরোধ কিংবা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে এক ধরনের বৈশ্বিক একক আধিপত্যবাদ প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় আছে। সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট ও তার পত্নীকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে— এটা চরম অসভ্যতা, বর্বরতা এবং দস্যুপনা।
দুই.
এদিকে দক্ষিণ এশিয়ায় পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক উত্তেজনাও অত্যন্ত উদ্বেগজনক। আফগান যুদ্ধের দীর্ঘ সময়ে, প্রায় চার দশক ধরে পাকিস্তান লক্ষ লক্ষ আফগান শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছে এবং সার্বিক সহযোগিতা করেছে। সেই ইতিহাসের পরও দুই মুসলিম ভাতৃপ্রতীম প্রতিবেশী দেশের মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হওয়ায় অনেক প্রশ্নের জন্ম দেয়। বিশেষ করে টিটিপি ইস্যু নিয়ে পাকিস্তানের অভিযোগ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা আশঙ্কা গুরুতর ইস্যু। অভিযোগ রয়েছে যে, টিটিপি কিছু তরুণকে বিভ্রান্ত করে কাবায়েলি অঞ্চলে অস্থিশীলতা জিইয়ে রাখছে এবং আফগান সরকারও তাদেরকে নানা ফ্যাসিলিটি দিচ্ছে।
কেউ কেউ বলেন, আফগানিস্তান যাতে এককভাবে চীনের প্রভাববলয়ে চলে না যায়, সে জন্য ভারত ও আমেরিকাও এখানে কূটনৈতিক খেলায় সক্রিয়। আফগানিস্তানের বিপুল খনিজ সম্পদ এবং কৌশলগত ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে ঘিরে কথিত বিশ্বমোড়লদের নোংরা খেলার শিকার হচ্ছে দুই দেশের নিরীহ মুসলিম জনগণ। এই যুদ্ধের নেপথ্যের খেলোয়াড় তারা।
উভয় দেশেরই উচিত সংযম প্রদর্শন করা এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের পথ খোঁজা। টিটিপি ইস্যুতে আফগান সরকারের অবস্থান স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। যদি এই বিষয়গুলো স্বচ্ছভাবে আলোচনার টেবিলে আনা যায়, তাহলে সংঘাতের সম্ভাবনা অনেকটাই কমে যাবে।
পাকিস্তান আর্মিতে মার্কিন প্রভাব বেশি। এই প্রভাবের কারণেই পাকিস্তান রাষ্ট্রের অস্তিত্ব লাভ করার পর থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত কোন সরকারই তার মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। পাকিস্তানের এস্টাবলিশমেন্ট মূলত সেনাবাহিনী, তারাই পর্দার আড়াল থেকে ক্ষমতার কলকাঠি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। ইমরান খানও তাদের প্রচ্ছন্ন সহায়তায় ক্ষমতায় এসেছিলেন, আবার তাদের সাথে বিরোধ হওয়ায় ক্ষমতাচুত হয়েছেন। চাউর আছে, বর্তমান পাক সরকার ক্ষমতায় আসার পেছনের চালিকাশক্তিও সেই সেনাবাহিনী।
বর্তমানে পাক আর্মির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হওয়া উচিত পাকিস্তানের সার্বভৌমত্ব ও স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। প্রতিবেশী মুসলিম রাষ্ট্রের সঙ্গে সংঘাতে জড়িয়ে পড়া পাকিস্তানের জন্য দীর্ঘমেয়াদে কোনো সুফল বয়ে আনবে না। বরং এতে সাধারণ মানুষের মধ্যে সেনাবাহিনীর প্রতি নেতিবাচক মনোভাব তৈরি হবে এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
যুদ্ধ ও সংঘাতের রাজনীতি বন্ধ হোক। যুদ্ধের রাজনীতি শেষ পর্যন্ত মানবতার পরাজয় ডেকে আনে। মধ্যপ্রাচ্য হোক বা দক্ষিণ এশিয়া, নিত্যনতুন যুদ্ধ সইবার সক্ষমতা পৃথিবীর আর নেই। এ যুদ্ধ সুন্দর বসুন্ধরায় শান্তি প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে অশান্তিই সৃষ্টি করবে। তাই এ অনাকাঙ্ক্ষি খাত যুদ্ধ বন্ধ করা হোক।
সম্পাদক: মোঃ আহসান উল্লাহ | প্রকাশক: মোঃ আতাউর রহমান রুবেল |
ফোন : 01715248243, 01577581026, ই-মেইল: notundrishti247@gmail.com