চীফ রিপোর্টার, আজিজুল হক
কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার সুতারপাড়া ইউনিয়নের সাগুলী গ্রামের বীর মুক্তিযোদ্ধা আলিমুদ্দিন সাহেব ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে কেবল একটি জীবনেরই অবসান ঘটেনি; বরং মুক্তিযুদ্ধের এক নীরব সাক্ষী, স্বাধীনতার এক প্রত্যক্ষ অংশীদার ইতিহাসের পাতায় স্থায়ী হয়ে গেলেন।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাঙালি জাতির অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রাম। এই যুদ্ধে শহরের পাশাপাশি গ্রামবাংলার অসংখ্য সাধারণ মানুষ জীবন বাজি রেখে স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলা ছিল সেইসব অঞ্চলের একটি, যেখানে মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণ গ্রামবাসীরা সংগঠিত হয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসরদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আলিমুদ্দিন সাহেব ছিলেন সেই সাহসী মানুষদের একজন। সাগুলী গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ হয়েও তিনি দেশের ডাকে সাড়া দিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর এই অংশগ্রহণ কেবল ব্যক্তিগত সাহসিকতার পরিচয় নয়; এটি ছিল স্বাধীনতার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের প্রতিফলন।
সুতারপাড়া ইউনিয়ন মুক্তিযুদ্ধের সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রামীণ জনপদ ছিল। এই ইউনিয়ন থেকে একাধিক মুক্তিযোদ্ধা যুদ্ধের ময়দানে অংশ নেন। যোগাযোগ ব্যবস্থা সীমিত, অস্ত্রের অভাব ও জীবনের ঝুঁকি—সবকিছুর মধ্যেও এখানকার মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্নকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। আলিমুদ্দিন সাহেব সেই সম্মিলিত প্রতিরোধের অংশ হয়ে ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠেন।
স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির মাধ্যমে যাদের বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সম্মান জানানো হয়েছে, আলিমুদ্দিন সাহেব তাঁদের অন্যতম। এই স্বীকৃতি শুধু একটি উপাধি নয়; এটি তাঁর ত্যাগ, সাহস ও দেশপ্রেমের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি। গ্রামের মানুষ আজও তাঁকে একজন বীর হিসেবে স্মরণ করেন—যিনি প্রয়োজনের মুহূর্তে নিজের জীবনকে দেশের জন্য উৎসর্গ করতে প্রস্তুত ছিলেন।
আলিমুদ্দিন সাহেবের ইন্তেকালে পরিবার, স্বজন ও এলাকাবাসী একজন অভিভাবকতুল্য মানুষকে হারালেন। তবে তাঁর রেখে যাওয়া সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার হলো—স্বাধীন বাংলাদেশ। নতুন প্রজন্ম হয়তো তাঁকে সরাসরি দেখেনি, কিন্তু তাঁর মতো মুক্তিযোদ্ধাদের আত্মত্যাগের কারণেই আজ তারা স্বাধীন দেশে কথা বলতে, লিখতে ও স্বপ্ন দেখতে পারে।
এমন অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার জীবনগাথা এখনও পুরোপুরি লিখিত হয়নি। আলিমুদ্দিন সাহেবের জীবনও গবেষণা ও স্মৃতিচারণার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা জরুরি। পরিবার, স্থানীয় প্রশাসন ও সমাজের দায়িত্ব হলো—এইসব বীরের গল্প নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা, যাতে মুক্তিযুদ্ধ কেবল পাঠ্যবইয়ের বিষয় না হয়ে জীবন্ত ইতিহাস হয়ে থাকে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আলিমুদ্দিন সাহেবের জীবন আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—স্বাধীনতা আপনা-আপনি আসেনি। এটি এসেছে অসংখ্য আলিমুদ্দিনের ত্যাগের বিনিময়ে। তাঁর ইন্তেকালে আমরা গভীর শোক প্রকাশ করছি এবং মহান আল্লাহর দরবারে তাঁর রূহের মাগফিরাত কামনা করছি।
আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।